বিশেষ প্রতিবেদক:
ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া এবং মানবিক বিভাগের চরম বিপর্যয়ে এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ফল বিপর্যয় ঘটেছে। গতকাল শনিবার প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, এবার গড় পাসের হার মাত্র ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা বিগত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০০৪ সালে পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। ফেল করেছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। এর মধ্যে শুধু ইংরেজি ও আইসিটিতেই ফেল করেছেন ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন, যা মোট অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর প্রায় ৬৪ শতাংশ।
এই বিপর্যয় সামাল দিতে দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী এক মাসের মধ্যে, প্রাথমিকভাবে ২ ডিসেম্বর এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে ঢাকা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে।
ইংরেজি ও আইসিটির কাঁটা:
তথ্য অনুযায়ী, ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন (৪১ শতাংশ) এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন (২৩.৩১ শতাংশ)।
ইংরেজি ও আইসিটিতে এই ফলাফলের পেছনে দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি ও জরাজীর্ণ শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। গণসাক্ষরতা অভিযানের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইংরেজি পড়ানো ৫৬ শতাংশ শিক্ষকেরই কোনো বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ নেই। এছাড়া শ্রেণিকক্ষে অনুশীলনের অভাব, মুখস্থনির্ভরতা এবং নিয়মিত চর্চার অভাব শিক্ষার্থীদের দুর্বল করে তুলছে।
বোর্ডভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ইংরেজিতে বরিশাল ও যশোরে ৪৬%, দিনাজপুর ও রাজশাহীতে ৪৪%, ময়মনসিংহে ৪১%, এবং সিলেট ও চট্টগ্রামে ৩৫% শিক্ষার্থী ফেল করেছেন। আইসিটিতে সর্বোচ্চ ফেল বরিশালে (৩৪%), যশোরে (৩৩%) এবং রাজশাহীতে (৩২%)। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী জানান, এই দুই বিষয়ের কারণে তাদের বোর্ডের পাসের হার বিগত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
জিপিএ-৫ এ বড় ধস:
এবার জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও নাটকীয়ভাবে কমেছে। গত বছর যেখানে ৬৯ হাজার ৯৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন, এবার তা ৪২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জনে (ছাত্র ২০,৩৬৩ এবং ছাত্রী ১৯,৭২১ জন)।
বরিশাল বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “আগে পাসের হার ও জিপিএ-৫ বাড়ানোর জন্য পরীক্ষকদের ওপর পরোক্ষ চাপ থাকত। কিন্তু গত দুই বছর ধরে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে—উত্তরপত্রে যতটুকু লেখা হবে, ঠিক ততটুকুই নম্বর দিতে হবে। এই ফল শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফেরার বার্তা দিচ্ছে।” প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিনও নিশ্চিত করেছেন, এবার খাতা শতভাগ নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
মানবিকে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়:
বিভাগওয়ারী বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় ৫০ দশমিক ৭৭ শতাংশ হলেও মানবিক বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ। মানবিক বিভাগের ৬ লাখ ৭ হাজার ৭৩৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩১১ জন। দিনাজপুর বোর্ডের সচিব অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক জানান, মানবিক ও বাণিজ্যের খারাপ ফলের কারণে সামগ্রিক হার কমে গেছে। বোর্ডের ৪৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে এবার একজনও পাস করতে পারেনি।
অনুরূপভাবে কুমিল্লা বোর্ডের ১৫টি কলেজ থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি বলে জানিয়েছেন বোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহসান পারভেজ। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
ছাত্রদের ফল বেশি খারাপ:
ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের পাসের হার এবার বেশ কম। ছাত্রদের মধ্যে যেখানে অকৃতকার্য হয়েছেন ৫২ দশমিক ২৫ শতাংশ, সেখানে ছাত্রীদের ক্ষেত্রে তা ৪৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ, ছাত্রদের অকৃতকার্য হওয়ার হার ছাত্রীদের চেয়ে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি।
কারণ অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞরা:
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা এই ফল বিপর্যয়ের পেছনে একাধিক সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ চিহ্নিত করেছেন। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম বলেন, “২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিতি, পড়াশোনায় মনোযোগের অভাব এবং বিজ্ঞান বা জটিল বিষয়গুলোতে ভীতি বড় কারণ।” এছাড়া বিশেষজ্ঞরা মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত আসক্তি এবং করোনাকালীন ও পরবর্তী সময়ে অভিভাবকদের নজরদারির অভাবকেও অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন।
এক নজরে এইচএসসি ২০২৬-এর ফল:
-
মোট পরীক্ষার্থী: ১২,৪০,৭৯৮ জন
-
মোট পাস: ৬,৪৬,৬৮৫ জন
-
মোট ফেল: ৫,৯৪,১১৩ জন (৪৮.৮৮%)
-
গড় পাসের হার: ৫২.১২% (২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন)
-
জিপিএ-৫: ৪০,০৮৪ জন (গতবারের চেয়ে ৪২% কম)
-
দুই বিষয়ে ফেল (ইংরেজি ও আইসিটি): ৩,৮২,০২১ জন
-
বিভাগওয়ারী পাসের হার: বিজ্ঞান- ৭৩.১২%, ব্যবসায় শিক্ষা- ৫০.৭৭%, মানবিক- ৪২.১৭%
-
ফেল করা ছাত্র: ৫২.২৫%, ফেল করা ছাত্রী: ৪৩.৬৯%সূত্রঃ সমকাল।










































