আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউরোপের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু তখন রাজতন্ত্র। কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মেলন নয়, বরং ব্রিটেনের রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া উপলক্ষে লন্ডনের উইন্ডসর ক্যাসেলে সমবেত হয়েছিলেন ইউরোপের প্রভাবশালী রাজন্যবর্গ। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে ক্যামেরাবন্দি হয় ইতিহাসের অন্যতম দুর্লভ ও আলোচিত এক আলোকচিত্র—যেখানে একসঙ্গে পোজ দিয়েছিলেন ইউরোপের নয়জন ক্ষমতাসীন সার্বভৌম রাজা।
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস, ক্যামেরার সামনে সামরিক পোশাকে দাঁড়িয়ে থাকা এই নিকটাত্মীয় রাজারা মাত্র চার বছর পর ১৯১৪ সালে অবতীর্ণ হন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত—প্রথম বিশ্বযুদ্ধে।
রক্তের বন্ধন ও ‘ইউরোপের নানী’র বৈবাহিক কূটনীতি
এক ফ্রেমে বন্দি নয়জন রাজার পারস্পরিক সম্পর্ক নিছক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের ছিল না; তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন রক্তসম্পর্কের ভাই, ভাগ্নে, মামা কিংবা বৈবাহিক সূত্রের নিকটাত্মীয়। ব্রিটিশ রানি ভিক্টোরিয়া (‘ইউরোপের নানী’) এবং ডেনমার্কের রাজা নবম ক্রিশ্চিয়ানের সুদূরপ্রসারী পারিবারিক কূটনীতির সুবাদে গোটা ইউরোপের রাজপরিবারগুলো এক সুবিশাল আত্মীয়তার জালে আবদ্ধ ছিল।
ছবির রাজন্যবর্গ: এক নজরে পরিচয় ও ঐতিহাসিক পরিণতি
| অবস্থান | রাজা ও দেশ | পারিবারিক পরিচয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব |
| দাঁড়িয়ে (বাম) |
রাজা সপ্তম হাকান
(নরওয়ে) |
ডেনমার্কের রাজপরিবারে জন্ম; সপ্তম এডওয়ার্ডের জামাতা ও রানি মডের স্বামী। |
| দাঁড়িয়ে |
জার ফার্দিনান্দ
(বুলগেরিয়া) |
স্যাক্সে-কোবার্গ-গোথা বংশের সদস্য; ১৯০৮ সালে অটোমানদের থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে জারের উপাধি নেন। |
| দাঁড়িয়ে |
রাজা দ্বিতীয় ম্যানুয়েল
(পর্তুগাল) |
ব্রাগাঞ্জা বংশের শেষ রাজা। ছবিটি তোলার মাত্র ৫ মাস পর (অক্টোবর ১৯১০) বিপ্লবের মুখে রাজতন্ত্র হারিয়ে নির্বাসনে যান। |
| দাঁড়িয়ে (মাঝে) |
কাইজার দ্বিতীয় উইলহেম
(জার্মানি) |
জার্মানির শেষ সম্রাট; রানি ভিক্টোরিয়ার জ্যেষ্ঠ নাতি ও পঞ্চম জর্জের খালাতো ভাই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর সিংহাসন ত্যাগ করতে বাধ্য হন। |
| দাঁড়িয়ে |
রাজা প্রথম জর্জ
(গ্রিস) |
ডেনমার্কের নবম ক্রিশ্চিয়ানের পুত্র; যুক্তরাজ্যের রানি আলেকজান্দ্রার ভাই এবং পঞ্চম জর্জের মামা। ১৯১৩ সালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। |
| দাঁড়িয়ে (ডান) |
রাজা প্রথম অ্যালবার্ট
(বেলজিয়াম) |
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির আগ্রাসনের মুখে নিজের দেশকে বীরত্বের সাথে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বজুড়ে মর্যাদা পান। |
| বসে (বাম) |
রাজা ত্রয়োদশ আলফোনসো
(স্পেন) |
জন্ম থেকেই স্পেনের রাজা; রানি ভিক্টোরিয়ার নাতনি ভিক্টোরিয়া ইউজিনির স্বামী। ১৯৩১ সালে দ্বিতীয় স্পেনীয় প্রজাতন্ত্র ঘোষণার পর দেশ ছাড়েন। |
| বসে (মাঝে) |
রাজা পঞ্চম জর্জ
(যুক্তরাজ্য) |
তৎকালীন যুক্তরাজ্যের নতুন রাজা; যাঁর পিতার শোকানুষ্ঠানে এই অনন্য মিলনমেলা ঘটেছিল। তিনি উইন্ডসর রাজবংশের পত্তন করেন। |
| বসে (ডান) |
রাজা অষ্টম ফ্রেডেরিক
(ডেনমার্ক) |
ডেনমার্কের রাজা; ব্রিটিশ রানি আলেকজান্দ্রা ও গ্রিসের রাজা প্রথম জর্জের ভাই। |
পারিবারিক কলহ থেকে বৈশ্বিক রক্তপাত
ইতিহাসবিদদের অনেকেই এই আলোকচিত্রকে অভিহিত করেন “The Last Royal Gathering of Europe” বা ইউরোপের শেষ রাজকীয় মিলনমেলা হিসেবে।
১৯১০ সালের এই ছবিটি যখন তোলা হয়, তখন ইউরোপ আপাতদৃষ্টিতে শান্ত ও আভিজাত্যের শীর্ষে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সামরিক চুক্তি, সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা এবং জাতীয়তাবাদের আগুন জ্বলছিল। কাইজার উইলহেম, রাজা পঞ্চম জর্জ এবং তৎকালীন রুশ জার দ্বিতীয় নিকোলাস (যিনি সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন)—এই তিন চাচাতো-খালাতো ভাইয়ের ব্যক্তিগত ও সাম্রাজ্যিক টানাপোড়েন মাত্র চার বছরের মাথায় রূপ নেয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে।
যুদ্ধের দাবানলে জার্মানি, পর্তুগাল, স্পেন ও বুলগেরিয়ার মতো বহু দেশের প্রাচীন রাজতন্ত্র চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। উইন্ডসর প্রাসাদের সেই উজ্জ্বল কক্ষে তোলা ছবিটি তাই কেবল রাজকীয় জাঁকজমকের স্মারক নয়, বরং একটি বিদায়ী যুগের করুণ প্রতিচ্ছবি।









